দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মরহুম দীর্ঘদিন ধরে কিডনি-জনিত রোগে আক্রান্ত ছিলেন। মঙ্গলবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টার দিকে তিনি স্ট্রোক করেন। পরে তাকে দ্রুত ময়মনসিংহের স্বদেশ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ২টা ৩০ মিনিটের দিকে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শেরপুর জেলা আমীর মাওলানা হাফিজুর রহমান। তিনি জানান, চিকিৎসাধীন অবস্থায় আলহাজ্ব নুরুজ্জামান বাদল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ থেকেও শোকবার্তা প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শেরপুর জেলা শাখার সম্মানিত সেক্রেটারি ও শেরপুর-৩ সংসদীয় আসনে জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী জনাব আলহাজ্ব নুরুজ্জামান বাদল আজ রাত আনুমানিক ৩ ঘটিকায় কিডনি-জনিত জটিলতায় হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন।’
শোকবার্তায় আরও বলা হয়, ‘আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও সহকর্মীবৃন্দকে ধৈর্য ধারণের তৌফিক দান করুন।’
নুরুজ্জামান বাদলের জীবনের শেষ সময়গুলোতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তার মানবিক নেতৃত্বও আলোচনায় আসে। গত ২৮ জানুয়ারি ঝিনাইগাতী মিনি স্টেডিয়ামে শেরপুর-৩ আসনের প্রার্থীদের ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ার বসানোকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
বিকেলে জামায়াতের নেতাকর্মীরা স্থান ত্যাগ করে শ্রীবরদীতে যাওয়ার পথে ঝিনাইগাতী বাজার এলাকায় বাধার মুখে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয়।
এ সময় নুরুজ্জামান বাদলকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমার চেয়ে নেতাকর্মীদের জীবনের মূল্য বেশি। নেতাকর্মীদের ফেলে রেখে আমি একা যাবো না।’
তার এই বক্তব্য নেতাকর্মীদের কাছে দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের এক মানবিক দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।
ওই সংঘর্ষের ঘটনায় পরে সন্ধ্যায় দ্বিতীয় দফায় গুরুতর আহত হন শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিম। উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহে নেওয়ার পথে ওই রাতেই তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ৩০ জানুয়ারি রাতে নিহতের স্ত্রী মারজিয়া ঝিনাইগাতী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় শেরপুর-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেলকে প্রধান আসামি করে ২৩৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করা হয়।
নুরুজ্জামান বাদলের শেষ দিনগুলোতে আরেকটি আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয় গত ১ ফেব্রুয়ারি শেরপুরে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনি জনসভায়। সেখানে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান জেলার তিনটি আসনের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন।
শেরপুর-৩ আসনের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের হাতে প্রতীক তুলে দেওয়ার সময় ডা. শফিকুর রহমান সম্প্রতি নিহত রেজাউল করিমের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘এই পাল্লাটি রক্তরঞ্জিত। এই পাল্লার পক্ষে কাজ করতে গিয়ে একটা ভাই জীবন দিয়েছে। হে আল্লাহ, এই শহীদের উছিলায় এই পাল্লাকে তুমি কবুল করো।’ এই কথা শুনে প্রকাশ্যে কান্নায় ভেঙে পড়েন নুরুজ্জামান বাদল। উপস্থিত নেতাকর্মীদের অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। দাঁড়িপাল্লা যেন তখন শুধুই একটি নির্বাচনি প্রতীক নয়, হয়ে ওঠে সহযোদ্ধা হারানোর রক্তাক্ত স্মৃতি।
দলীয় সূত্র জানায়, মরহুম আলহাজ্ব নুরুজ্জামান বাদলের জানাজা আজ দুই স্থানে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম জানাজা শেরপুর শহরের পৌর ঈদগাহ মাঠে দুপুর ৩টায় অনুষ্ঠিত হয়। পরে দ্বিতীয় জানাজা শ্রীবরদী সরকারি কলেজ মাঠে বিকাল ৫টা ৩০ মিনিটে অনুষ্ঠিত হয়।
আলহাজ্ব নুরুজ্জামান বাদল শেরপুর-৩ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তার মৃত্যুতে শেরপুর জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে। দলীয় নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।
এদিকে তার মৃত্যুতে শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের নির্বাচন স্থগিত করেছেন নির্বাচন কমিশন। ১২ ফেব্রুয়ারির আগে তফসিল ঘোষণা হবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
Leave a Reply