এলাকাবাসীর অভিযোগ, উপজেলা যুবলীগের প্রচার সম্পাদক আব্দুর রহমান বাবু উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব আনোয়ারুল ইসলাম আঙ্গুরের নামে বালুমহালের ইজারা নিয়েছেন। আর সার্বিক বিষয় তত্ত্বাবধানে আছেন জামায়াতে ইসলামীর যুব ইউনিটের গাবুরা ইউনিয়ন সভাপতি ইয়াছিন আরাফাত। তিন দলের যুব সংগঠনের প্রধানের দাপটে ভাঙনকবলিত অংশের বাসিন্দার আপত্তি ও অভিযোগ প্রশাসনের কাছে পাত্তাই পাচ্ছে না।
পদ্মপুকুর ইউনিয়নের গলাটেপা খেয়াঘাটসংলগ্ন গ্রামের বাসিন্দা রণজিৎ মণ্ডলের ভাষ্য, ‘প্রতি বছর আমরা ভাঙনের মুখি পড়তিছি। বাপ-দাদার ভিটে আগেই গিলে খেয়েছে নদী। বাধ্য হয়ে এখন অন্যদের মতো বাঁধের পাশে বসত গড়িছি। অথচ কপোতাক্ষ নদ থেকে প্রতিদিন যেভাবে বালু তুলতেছে, তাতে আমাগো আবারও ভাঙনের মুখি পড়তি হবি।’
ভাঙনকবলিত অংশ থেকে অবৈধভাবে বালু তোলার অভিযোগ শুধু এ দুজনের নয়। শ্যামনগরের পোড়াকাটলা গ্রামের সরস্বতী মাঝি, দুর্গাবাটির যতীন্দ্র মণ্ডল, নীলকান্ত রপ্তান, কলবাড়ির রুস্তম আলীসহ খোলপেটুয়া নদী ও কপোতাক্ষ নদের পাশে অবস্থিত উপজেলার আটুলিয়া, পদ্মপুকুর, গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, কাশিমাড়ী; আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের হাজারো মানুষের।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগকবলিত ও ভাঙনপ্রবণ হওয়ায় এসব এলাকাকে চলতি বছর (বাংলা ১৪৩২ সাল) সরকার বালুমহালের বাইরে রেখেছিল। তবে জনগুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা জানিয়ে আশাশুনি উপজেলার হিজলদিয়া মৌজার মাত্র পাঁচ একর জায়গা বালুমহাল ঘোষণা করা হয়। অথচ হিজলদিয়া মৌজার সেই সামান্য জায়গাকে পুঁজি করে ইজারাগ্রহীতা ‘গাজী এন্টারপ্রাইজ’ পুরো খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদের বালু লুটে চলছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এশার নামাজের পর থেকে ফজরের আজান পর্যন্ত কার্গোগুলো খোলপেটুয়া নদীর খোশালখালীর চর, বিড়ালাক্ষ্মীর চর, ঘোলার চর থেকে বালু ওঠায়। অব্যাহতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে গড় পদ্মপুকুরের চেয়ারম্যানের হুলো, ঘোলা ত্রিমোহনী, হলদেবুনিয়া, জেলেখালী, খোশালখালী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে ভাঙনের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
শ্যামনগরের পানখালীর সুজন মহালদার ও মুন্সীগঞ্জের শীবপদ মণ্ডলের ভাষ্য, আশাশুনির হিজলদিয়ার নির্দিষ্ট বালুমহাল থেকে শ্যামনগরের নওয়াবেঁকী আড়তে বালু পৌঁছাতে প্রায় আট টাকা খরচ পড়ে। সে জন্য অধিক মুনাফার জন্য যুবলীগ, যুবদল ও জামায়াতের যুব ইউনিটের তিন নেতা গাজী এন্টারপ্রাইজের নামে খোলপেটুয়া নদী ও কপোতাক্ষ নদের যত্রতত্র বাল্কহেড এনে ড্রেজার দিয়ে বালু তুলছেন। এলাকাবাসী নৌ পুলিশের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তবে তারা অভিযান চালাতে নানা টালবাহানা করছে।
বক্তব্য জানতে জামায়াতের যুব ইউনিটের গাবুরা ইউনিয়ন সভাপতি ইয়াছিন আরাফাতের মোবাইল ফোনে কল দিলে প্রশ্ন শুনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার কল দিলেও ধরেননি। যুবদলের শ্যামনগর উপজেলা শাখার সদস্য সচিব অনোয়ারুল ইসলাম আঙ্গুরের মোবাইল ফোনে কল দিলে তিনিও ধরেননি। খুদে বার্তার উত্তর মেলেনি। যুবলীগের শ্যামনগর উপজেলা কমিটির প্রচার সম্পাদক আব্দুর রহমান বাবুর দাবি, ‘নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়া আমাদের বালু ওঠানো হয় না।’ কৌশলগত কারণে তারা কয়েকজন একসঙ্গে ব্যবসা করছেন বলেও স্বীকার করেন।
অভিযানে গড়িমসির বিষয়ে বুড়িগোয়ালিনী নৌ পুলিশের ওসি অহিদুজ্জামান বলেন, ‘তারা কি আবারও শুরু করছে? কয়দিন থামছিল, ঠিক আছে, এসিল্যান্ড সাহেবকে একটু জনাই রাখেন।’
শ্যামনগরের ইউএনও শামছুজ্জাহান কনকের ভাষ্য, অবৈধভাবে বালু তোলার খবর পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে নৌ পুলিশকে আবারও নির্দেশনা দেওয়া হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ইমরান সরদার বলেন, এখন কোনো বালুমহাল নেই। যারা বালু ওঠাচ্ছেন, তারা চুরি করে তুলছেন। যত্রতত্র বালু তোলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নদী। এই প্রবণতা বন্ধ না হলে কোনোভাবে উপকূল রক্ষা বাঁধ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।






















Leave a Reply